বর্তমান স্মার্টফোন বাজারে ৫০-৬৫ হাজার টাকার রেঞ্জে এমন একটি ফোন খোঁজা যা ডিজাইন, ক্যামেরা আর পারফরম্যান্স তিন বিষয়েই নিরাশ করবে না, সেটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ভিভোর নতুন Vivo S20 Pro ঠিক সেই জায়গাটিতে হাজির হয়েছে। চীনে গত বছরের ডিসেম্বরে লঞ্চ হওয়া এই ফোনটি এখন বাংলাদেশের গ্রে মার্কেটে পাওয়া যাচ্ছে।
ফোনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ? প্রিমিয়াম লুকিং ডিজাইন, ফ্ল্যাগশিপ-গ্রেড MediaTek Dimensity 9300+ প্রসেসর, আর সব ক্যামেরাতেই ৫০ মেগাপিক্সেল সেন্সর। এক কথায় বাজেটের মধ্যে ফ্ল্যাগশিপ অনুভূতি দিতে চাইছে ভিভো।
এক নজরে দাম: বাংলাদেশে বর্তমানে Vivo S20 Pro-র আনঅফিসিয়াল দাম পড়ছে প্রায় ৳৫৫,০০০ থেকে ৳৬৫,০০০ পর্যন্ত (ভ্যারিয়েন্ট অনুযায়ী)।
বাংলাদেশে Vivo S20 Pro এর বর্তমান অফিসিয়াল ও আনঅফিসিয়াল দাম
দুঃখজনক হলেও সত্যি, Vivo S20 Pro বাংলাদেশে অফিসিয়ালি লঞ্চ হয়নি। তাই দেশের বাজারে যেসব ফোন পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো আমদানিকৃত (ইমপোর্টেড) বা গ্রে মার্কেটের পণ্য। এর মানে হলো — ভিভো বাংলাদেশের অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি পাবেন না। তবে কিছু দোকান থেকে দোকানের নিজস্ব রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি পেতে পারেন।
ভ্যারিয়েন্ট অনুযায়ী দাম:
| ভ্যারিয়েন্ট | আনঅফিসিয়াল দাম (বাংলাদেশ) |
|---|---|
| ১২GB RAM + ২৫৬GB ROM | ৳৫৫,০০০ – ৳৫৮,০০০ |
| ১২GB RAM + ৫১২GB ROM | ৳৫৮,০০০ – ৳৬২,০০০ |
| ১৬GB RAM + ৫১২GB ROM | ৳৬০,০০০ – ৳৬৫,০০০ |
নোট: দাম দোকান এবং আমদানি খরচের ওপর নির্ভরশীল। চীনে Vivo S20 Pro-র অফিসিয়াল দাম ছিল CNY ৩,৩৯৯ (প্রায় ৳৫৩,০০০) ১২GB+২৫৬GB ভ্যারিয়েন্টের জন্য।
অফিসিয়াল বনাম আনঅফিসিয়াল — কী পাবেন, কী পাবেন না?
| বিষয় | অফিসিয়াল | আনঅফিসিয়াল |
|---|---|---|
| ওয়ারেন্টি | ভিভো বাংলাদেশের ওয়ারেন্টি | দোকানের নিজস্ব গ্যারান্টি |
| আফটার-সেলস সার্ভিস | সারাদেশে সার্ভিস সেন্টার | সীমিত |
| সফটওয়্যার আপডেট | নিয়মিত OTA আপডেট | সমস্যা হতে পারে |
| চার্জার/বক্স | অরিজিনাল | অরিজিনাল (চীন ভার্সন) |
Vivo S20 Pro স্পেসিফিকেশন
| ফিচার | বিবরণ |
|---|---|
| ডিসপ্লে | ৬.৬৭ ইঞ্চি AMOLED, ১২৬০×২৮০০ পিক্সেল, ১২০Hz রিফ্রেশ রেট, ৫০০০ নিটস পিক ব্রাইটনেস |
| প্রসেসর | MediaTek Dimensity 9300+ (4nm) |
| RAM | ১২GB / ১৬GB (LPDDR5T) |
| স্টোরেজ | ২৫৬GB / ৫১২GB (UFS 3.1) |
| রিয়ার ক্যামেরা | ৫০MP ওয়াইড (OIS) + ৫০MP পেরিস্কোপ টেলিফোটো (৩x অপটিক্যাল জুম, OIS) + ৫০MP আলট্রাওয়াইড |
| সেলফি ক্যামেরা | ৫০MP, AF সাপোর্টেড |
| ব্যাটারি | ৫৫০০mAh, ৯০W ফাস্ট চার্জিং |
| ওএস | Android 15 (OriginOS 5) |
| ওজন | ১৯৪ গ্রাম |
| IP রেটিং | IP64 (ধুলো ও পানির ছিটা প্রতিরোধী) |
| অন্যান্য | স্টেরিও স্পিকার, Wi-Fi 7, Bluetooth 5.4, NFC, IR ব্লাস্টার |
বিস্তারিত রিভিউ ও ফিচার বিশ্লেষণ
প্রিমিয়াম ডিজাইন ও কার্ভড AMOLED ডিসপ্লে
Vivo S20 Pro হাতে নিলে প্রথমেই যেটা মনে হয় — “এটা কি ৫০ হাজারের ফোন নাকি ৮০ হাজারের?” গ্লাস ব্যাক, প্লাস্টিক ফ্রেম আর মাত্র ৭.৫ মিমি পুরুত্বের বডি — ফোনটি হাতে ধরলেই প্রিমিয়াম ফিল পাবেন।
ডিসপ্লেটি ৬.৬৭ ইঞ্চির ১.৫K AMOLED প্যানেল। রেজোলিউশন ১২৬০×২৮০০ যা রিটিনা-লেভেল শার্পনেস দেয়। ১২০Hz রিফ্রেশ রেট স্ক্রলিং আর গেমিং দুটোতেই স্মুথ। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো ৫০০০ নিটস পিক ব্রাইটনেস — রোদের নিচে স্ক্রিন দেখতে কোনো সমস্যা হবে না।
ফ্ল্যাগশিপ লেভেল প্রসেসর ও গেমিং পারফরম্যান্স
আউটলাইনে Snapdragon ৮s Gen ৩ উল্লেখ থাকলেও, আসলে Vivo S20 Pro-তে রয়েছে MediaTek Dimensity 9300+ — যা ৪nm আর্কিটেকচারে তৈরি। এই চিপসেট বর্তমানে মার্কেটের সেরা ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসরগুলোর একটির আপগ্রেডেড ভার্সন। CPU-তে ৪টি Cortex-X4 কোর থাকায় মাল্টিটাস্কিং আর হেভি গেমিং দুটোতেই দারুণ পারফরম্যান্স।
গেমিং বাস্তবতা:
- PUBG Mobile: HDR + Ultra সেটিংে ফ্রেম ড্রপ ছাড়াই চলবে
- Genshin Impact: হাই সেটিংে ৫০-৬০ FPS স্থিতিশীল
- UFS 3.1 স্টোরেজের কারণে গেম লোডিং টাইম কম
Immortalis-G720 MC12 GPU গ্রাফিক্স-ইনটেনসিভ গেমেও হিমশিম খাবে না। ১২GB বা ১৬GB LPDDR5T RAM মাল্টিটাস্কিংয়ে কোনো বাধা দেবে না।
প্রফেশনাল ক্যামেরা সেটআপ (Studio Quality Camera)

Vivo S20 Pro-র ক্যামেরা সেটআপ সত্যিই ইউনিক। তিনটি ক্যামেরাই ৫০ মেগাপিক্সেলের — কোনো ফিলার সেন্সর নেই।
প্রাইমারি ক্যামেরা (৫০MP ওয়াইড): ১/১.৫৬” সেন্সর সাইজ, f/1.9 অ্যাপারচার আর OIS। দিনের আলোয় ডিটেইলস চমৎকার, আর নাইট মোডে নয়েজ কন্ট্রোলও ভালো।
পেরিস্কোপ টেলিফোটো (৫০MP, ৩x অপটিক্যাল জুম): ৮৫মিমি ফোকাল লেংথের এই ক্যামেরাটি পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফারদের জন্য ব্লেসিং। ৩x অপটিক্যাল জুমে ছবি ক্রপ করে নিলেও কোয়ালিটি ধরে রাখে। OIS থাকায় হাত কাঁপলেও ছবি ব্লার হবে না।
আলট্রাওয়াইড (৫০MP): ম্যাক্রো আর গ্রুপ শটের জন্য দারুণ। AF সাপোর্টেড হওয়ায় ক্লোজ-আপ শটেও ফোকাস ঠিক থাকে।
সেলফি ক্যামেরা (৫০MP): ভিভো সিরিজের সেলফির খ্যাতি কারো অজানা নয়। ৫০MP ফ্রন্ট ক্যামেরায় 4K ভিডিও রেকর্ডিং সম্ভব।
ব্যাটারি লাইফ ও ৯০ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং
৫৫০০mAh ব্যাটারি মিডিয়াম ব্যবহারে একদিন সহজেই পার করবে। হেভি গেমিং করলে ৬-৭ ঘণ্টা স্ক্রিন-অন টাইম পাবেন।
তবে আসল চমক হলো ৯০W ফাস্ট চার্জিং। চার্জার বক্সে থাকলে প্রায় ৩৫-৪০ মিনিটে ০ থেকে ১০০% চার্জ হয়ে যাবে। রিভার্স চার্জিং সাপোর্ট থাকায় অন্য ফোন বা ইয়ারবাডস চার্জ করতে পারবেন।
সফটওয়্যার ও ইউজার ইন্টারফেস
Vivo S20 Pro চায়না ভার্সনে চলে Android 15 ভিত্তিক OriginOS 5। বাংলাদেশে কিনলে আপনাকে OriginOS-এর সাথেই চলতে হবে — Funtouch OS নয়। ভাষা ইংরেজি/চাইনিজ সাপোর্ট থাকলেও বাংলা ভাষা সাপোর্ট চেক করে নেওয়া ভালো। Google Play Services ইন্সটল করা থাকে কিনা, সেটাও কেনার আগে নিশ্চিত হোন।
সুবিধা ও অসুবিধা
Pros — কেন কিনবেন?
- ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসর: Dimensity 9300+ গেমিং আর মাল্টিটাস্কিংয়ে টপ-টিয়ার পারফরম্যান্স
- ট্রিপল ৫০MP ক্যামেরা: কোনো ক্যামেরাই আই-ক্যান্ডি নয় — সবগুলোই কাজের
- ৫০০০ নিটস ব্রাইটনেস: রোদের নিচে স্ক্রিন দেখা সমস্যা হবে না
- ৯০W চার্জিং: অল্প সময়ে ফুল চার্জ
- প্রিমিয়াম বিল্ড: ৭.৫মিমি স্লিম বডি, মাত্র ১৯৪ গ্রাম ওজন
- স্টেরিও স্পিকার: Dolby Atmos সাপোর্টেড
- IP64 রেটিং: ধুলো আর পানির ছিটা থেকে সুরক্ষা
Cons — যে বিষয়গুলো লক্ষণীয়
- অফিসিয়ালি লঞ্চ হয়নি: ভিভো বাংলাদেশের ওয়ারেন্টি পাবেন না
- মাইক্রোএসডি কার্ড স্লট নেই: স্টোরেজ এক্সপ্যান্ড করা যাবে না
- ৩.৫মিমি হেডফোন জ্যাক নেই: USB Type-C বা ওয়্যারলেস ইয়ারফোন ব্যবহার করতে হবে
- OriginOS: Funtouch OS নয়, চায়না ভার্সন সফটওয়্যার — Google সার্ভিস নিয়ে সমস্যা হতে পারে
- ওয়্যারলেস চার্জিং নেই: ২০২৬ সালে এই দামে এটি একটি মাইনাস
Vivo S20 Pro কার জন্য সেরা পছন্দ?
এই ফোনটি কিনতে পারেন যদি আপনি:
ফটোগ্রাফি লাভার: ট্রিপল ৫০MP ক্যামেরা সেটআপ, বিশেষ করে ৩x পেরিস্কোপ টেলিফোটো লেন্স পোর্ট্রেট আর জুম ফটোগ্রাফিতে দারুণ কাজ দেবে।
গেমার: Dimensity 9300+ চিপসেট PUBG, Genshin Impact, Call of Duty Mobile-এর মতো হেভি গেম স্মুথলি চালাতে পারবে। ১২০Hz ডিসপ্লে আর ৫০০০ নিটস ব্রাইটনেস আউটডোর গেমিংয়েও সুবিধা করবে।
স্টাইলিশ ফোন ব্যবহারকারী: স্লিম বডি, হালকা ওজন আর আই-ক্যাচিং ডিজাইন — দেখতেই যেন ৮০ হাজারের ফোন।
এই বাজেটে প্রতিদ্বন্দ্বীরা:
| ফোন | প্রসেসর | ক্যামেরা | দাম (আনঅফিসিয়াল) |
|---|---|---|---|
| Vivo S20 Pro | Dimensity 9300+ | ট্রিপল ৫০MP | ৳৫৫,০০০ – ৬৫,০০০ |
| Realme GT 6 | Snapdragon 8s Gen 3 | ৫০MP + ৮MP | ৳৫০,০০০ – ৫৫,০০০ |
| Xiaomi 14T | Dimensity 8300-Ultra | ৫০MP ট্রিপল | ৳৫৫,০০০ – ৬০,০০০ |
| Samsung Galaxy A55 5G | Exynos 1480 | ৫০MP ট্রিপল | ৳৪৫,০০০ – ৫০,০০০ |
Vivo S20 Pro-র সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ হলো Dimensity 9300+ প্রসেসর — যা এই রেঞ্জের অন্য কোনো ফোনে পাবেন না। ক্যামেরা ডিপার্টমেন্টেও পেরিস্কোপ জুম একটি বড় প্লাস।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
Vivo S20 Pro কি বাংলাদেশে অফিসিয়ালি পাওয়া যায়?
না। Vivo S20 Pro বাংলাদেশে অফিসিয়ালি লঞ্চ হয়নি। বাজারে যেসব ফোন পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো আমদানিকৃত (ইমপোর্টেড) বা গ্রে মার্কেটের পণ্য।
Vivo S20 Pro এর ব্যাটারি কত mAh?
৫৫০০mAh। সাথে রয়েছে ৯০W ফাস্ট চার্জিং সাপোর্ট।
এই ফোনে কি ৫G নেটওয়ার্ক সাপোর্ট করে?
হ্যাঁ। Vivo S20 Pro-তে SA/NSA দুটো ৫G ব্যান্ডই সাপোর্টেড।
Vivo S20 Pro কি ওয়াটারপ্রুফ?
আংশিক। ফোনটিতে IP64 রেটিং রয়েছে — অর্থাৎ ধুলো প্রবেশ করতে পারবে না আর পানির ছিটা সহ্য করতে পারবে। তবে পানিতে ডুবিয়ে রাখা যাবে না।
ফোনটিতে কি স্টেরিও স্পিকার আছে?
হ্যাঁ। Dolby Atmos সাপোর্টেড স্টেরিও স্পিকার রয়েছে।
RAM ও ROM কতো?
তিনটি ভ্যারিয়েন্ট: ১২GB+২৫৬GB, ১২GB+৫১২GB, এবং ১৬GB+৫১২GB।
মেমোরি কার্ড দিয়ে স্টোরেজ বাড়ানো যাবে?
না। মাইক্রোএসডি কার্ড স্লট নেই। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বড় স্টোরেজ ভ্যারিয়েন্ট কিনুন।
Google Play Store কি থাকবে?
চায়না ভার্সনে সাধারণত Google Play Services থাকে না। তবে বাংলাদেশে যেসব দোকান বিক্রি করে, তারা অনেক সময় Play Services ইন্সটল করে দেয়। কেনার আগে অবশ্যই চেক করে নিন।
উপসংহার
Vivo S20 Pro ৫০-৬৫ হাজার টাকার রেঞ্জে একটি ফ্ল্যাগশিপ কিলার ডিভাইস। Dimensity 9300+ প্রসেসর, ট্রিপল ৫০MP ক্যামেরা সেটআপ, ৫৫০০mAh ব্যাটারি আর ৯০W চার্জিং এই কম্বিনেশন এই দামে বিরল।
তবে একটা বড় “কিন্তু” আছে। ফোনটি বাংলাদেশে অফিসিয়ালি লঞ্চ না হওয়ায় ওয়ারেন্টি নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। OriginOS আর Google Services নিয়েও কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে।
কিনবেন যদি:
- আপনার বাজেট ৫৫-৬০ হাজারের মধ্যে
- গেমিং আর ক্যামেরা — দুটোতেই টপ পারফরম্যান্স চান
- অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি নিয়ে খুব একটা চিন্তা না করেন
- দোকান ভালোভাবে চিনেন যেখান থেকে কিনছেন
কিনবেন না যদি:
- অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি আপনার কাছে প্রাধান্য পায়
- সফটওয়্যার আপডেট নিয়ে ঝামেলা পছন্দ না করেন
- বাংলাদেশে সহজলভ্য আফটার-সেলস সার্ভিস চান
লেখকের পরামর্শ: Vivo S20 Pro কেনার আগে অবশ্যই দোকানে গিয়ে ফোনটি হাতে নিয়ে চেক করুন। ক্যামেরা, স্পিকার আর Google Play Services ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা — তিনটি বিষয় অবশ্যই টেস্ট করে নিন। আর দোকানের রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টির শর্তাবলী ভালোভাবে পড়ে নিন।
তথ্যসূত্র:










